সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা আগের মত নেই

২১,মঙ্গলবার ২০২৩
মোঃ আজিজুল ইসলাম :
সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিএনপি নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুতে অনড় থাকলেও তলে তলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। অপরদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারের সাথে ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব চুক্তি’ করে রাজপথের আন্দোলন থেকে সরে এসেছে জামায়াত। প্রকাশ্যে কোন আন্দোলনে না থাকলেও এই সংগঠনটি গতবছর বিএনপি জোট থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছিল। আর দেশের ৩০০ আসনের বিপরীতে ইতোমধ্যে ১২০আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে তারা। তলে তলে সংগঠনকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে গোপনে নির্বাচনী কার্যক্রমও চালাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। তবে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবার চোখ এখন জাতীয় পার্টির দিকে!
১৯৮৬সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি পাঁচটি অংশে ভাগ হয়েছে। বর্তমানে জাপার মূল অংশ নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ও চেয়ারম্যান জি এম কাদের। বর্তমান সংসদে জাপার মূল অংশের ২৪ সদস্য প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি বড় ধরণের একটা ফ্যাক্ট হলেও জাতীয় পার্টিতে নাটকীয়তা নতুন কিছু নয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদের মৃত্যুর পর দেবর-ভাবির বিরোধে বর্তমানে জাতীয় পার্টির অবস্থা একত্রিত হয়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নতুন করে দলটি পলিটিকাল ড্রামা দেখাবে বলে এখন ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের কাছে।
সাতক্ষীরা জেলার রাজনীতিতে এক সময় জাতীয় পাটির বেশ সুদৃঢ় অবস্থান ছিল। ২০০৮ এর নির্বাচনে জেলার দুটি আসনে জাতীয় পাটির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। কিন্তু ২০১৪ এর নির্বাচনে মহাজোটের শরিক হিসেবে জাতীয় পাটিকে দুটি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু সেই লক্ষ্মি পায়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার মত জাতীয় পাটির প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাড়ায়। এরপর থেকে জাতীয় পার্টি জেলার রাজনীতি থেকে দূর্বল থেকে আরো দূর্বল হতে থাকে।
এদিকে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি আসনে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যখন তৎপর তখন ব্যতিক্রম অবস্থানে জাতীয় পার্টি। টানা দুই মেয়াদে জাতীয় পার্টি দেশের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকলেও সেই অর্থে সাতক্ষীরার শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে জাতীয় পার্টি নিজেদের জায়গা ও কর্মী সমর্থক বাড়াতে পারেনী জেলার বর্তমান কমিটি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী ও দলটির আদ্যপ্রান্ত :
টানা দুই মেয়াদে জাতীয় পার্টি (জাপা) বিরোধী দলের ক্ষমতায় থাকলেও সাতক্ষীরায় জাতীয় পার্টির অবস্থান নড়বড়ে। কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বন্দ্বের তেমন কোন প্রভাব নেই তৃণমূলে। কিন্তু তারপরও বর্তমানে সাতক্ষীরায় সে অর্থে (শহর কেন্দ্রীক ব্যতিত) দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই বললেও চলে।
সাতক্ষীরা-১ :
জেলার কলারোয়া ও তালা উপজেলা নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা-১ আসন। এ আসন থেকে সর্বশেষ ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সাতক্ষীরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সৈয়দ দীদার বখত। সেবারের নির্বাচন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদী দল, জামায়াতে ইসলামী, কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রধান দলই বর্জন করে। ওই নির্বাচনে জয়লাভ করার পর ১৯৮৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর সৈয়দ দীদার বখত এরশাদের মন্ত্রিসভায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এবং ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০০০ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন কিন্তু বিএনপি থেকে সাতক্ষীরা-১ আসনের মনোনয়ন না পাওয়ায় লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় জাতীয় পার্টিতে ফিরে আসেন এবং ২০১৯ সালের মে মাসে তাকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য করা হয়। যদিও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেও প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের কম ভোট পাওয়াতে জামানত বাজেয়াপ্ত হয় তার। তবে, জেলার চারটি আসনে অবস্থিত সাতটি উপজেলার ভিতরে এঁর উপজেলা তালা জাতীয় পার্টি সাংগঠনিকভাবে অনেক মজবুত। এই আসনটিতে সাবেক সংসদ ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার সুবাদে পরিচিত। সৈয়দ দীদার বখত- ও ক্লিন ইমেজের প্রতিচ্ছবি কেন্দ্রীয় নেতা তৃণমূল কর্মী বান্ধব নেতা এডঃ এম এ সাত্তার জাতীয় পার্টি থেকে সাতক্ষীরা-১ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হবেন সেটা একপ্রকার নিশ্চিত।
সাতক্ষীরা-২ :
মহাজোটের প্রার্থী হয়ে সর্বশেষ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এ আসনে জয় পায় জাতীয় পার্টি। এরপর অনুষ্ঠিত দুটি সংসদ নির্বাচনের একটিতে জাতীয় পার্টি কোনপ্রার্থী দেয়নি। এবারের নির্বাচনে এই আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় নেতা শেখ মাতলুব হোসেন লিয়ন। কেন্দ্রের সাথে সুসম্পর্ক আছে। তৃনমূল কর্মীদের কে পুজি করে তিনি মাঠে থাকতে চান। এছাড়াও জেলার রাজনীতিতে বেশ জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে ক্লিন ইমেজের নেতা হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ আজহার হোসেন, এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
সাতক্ষীরা-৩:
এই আসন থেকে এপর্যন্ত একবার জয় পেয়েছে জাতীয় পার্টি। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এড. স ম সালাহউদ্দিন। এর আগে ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করলে সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। এরপর থেকে জাতীয় পার্টির কোন প্রার্থী এ আসন থেকে জয় পাইনি। তবে, এবারের নির্বাচনে এ আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নের তালিকায় এড. স ম সালাহউদ্দিনসহ দেবহাটা উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান আবুল ফজলের নাম শোনা যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা-৪:
সর্বশেষ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির গোলাম রেজা নির্বাচনে জয়লাভ করেন। এরপর দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এ আসন ফিরে পায়নি জাতীয় পার্টি। তবে এই আসনে জাতীয় পার্টির যেমন প্রভাব রয়েছে তেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ও জামায়াতের প্রভাব থাকাই এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চর্তুমূখি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টির হয়ে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন কালিগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবর রহমানসহ আরও কয়েকজন।
দ্বাদশ নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীর ভাবনা:
জাতীয় পার্টির প্রধান দুই কর্ণধারদের বিরোধের তেমন কোন প্রভাব নেই এই জেলায়। তারপরও ইতোপূর্বে জাতীয় পার্টির নেতাদের বিরোধের কারণে দলটি তার সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রাখতে পারেনি।
এবারের নির্বাচনে কেমন প্রার্থী চান তারা? প্রশ্নের জবাবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলেন, আমরাতো এখনও এটা জানিনা এবার জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরিক হয়ে নির্বাচন করবে নাকি মহাজোট ব্যতিত নির্বাচন করবে। সম্প্রতি শুনছি জাতীয় পার্টি এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিবে। তবে, সেটা যদি হয় তাহলে সাতক্ষীরায় প্রার্থীর সংকট হবে না।
সবমিলিয়ে, সাতক্ষীরার চারটি আসনে আ.লীগের অভ্যন্তরীন কোন্দল, জামাতের জোট ছাড়ার ঘোষণা, বিএনপির যোগ্য প্রার্থীর সংকট, জাতীয় পার্টির সুনিদিষ্ঠ স্ট্যান্ড না থাকায় বিভ্রান্ত জনগন। এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেকোন দলের প্রার্থীকে জয় পেতে হলে তরুণ ও ভাসমান ভোটারদের সমর্থন লাগবে। অন্যথায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে জেলার সবকয়টি আসনে ।

